৪১ বছরের অধ্যক্ষ জীবনের ইতি টেনে অবসরজনিত বিদায় নিলেন বলদীআটা ফাযিল (ডিগ্রী) মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আফজাল হোসাইন
- আপডেট সময় : ০৭:৪৪:৪৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ১৯৫ বার পড়া হয়েছে
৪১ বছরের অধ্যক্ষ জীবনের ইতি টেনে অবসরজনিত বিদায় নিলেন বলদীআটা ফাযিল (ডিগ্রী) মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আফজাল হোসাইন
ছামিউল ইসলাম রিপন (বিশেষ প্রতিনিধি):
একটি দীর্ঘ অধ্যায় আজ নিঃশব্দে শেষ হলো। সময়ের স্রোতে মিলিয়ে গেল এক আলোকবর্তিকার কর্মজীবন। টাঙ্গাইল জেলার ধনবাড়ী উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বলদীআটা ফাযিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আফজাল হোসাইন আজ তাঁর শেষ কর্মদিবসে অবসরজনিত বিদায় নিলেন। দীর্ঘ ৪১ বছরের শিক্ষকতা ও অধ্যক্ষ জীবনের ইতি টানলেন তিনি—গৌরব, দায়িত্ব আর নিঃস্বার্থ সেবার এক অনন্য ইতিহাস রেখে।
আজকের দিনটি তাঁর জীবনে যেমন ছিল অর্জনের পরিপূর্ণতা, তেমনি ছিল অশ্রুতে ভেজা এক কঠিন বিদায়। আগামী ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে ষাট বছর পূর্ণের মাধ্যমে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটবে। তবে কর্মের ইতি ঘটলেও তাঁর আদর্শ, শিক্ষা ও ভালোবাসা থেকে যাবে প্রজন্মের পর প্রজন্মের মাঝে।
ব্যতিক্রমী এক পথচলার অধিকারী ছিলেন অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আফজাল হোসাইন। শিক্ষকতা জীবনের শুরু থেকেই তিনি অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেছেন—যা বিরল ও গর্বের।
১৯৮৫ সালে টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর উপজেলার রাধানগর ফাযিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসায় সদ্য শিক্ষাজীবন শেষ করা এক তরুণ শিক্ষাবিদ হিসেবে অধ্যক্ষ পদে তাঁর কর্মজীবন শুরু। সততা, নিষ্ঠা, দৃঢ়তা ও মেধার সমন্বয়ে তিনি দ্রুতই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন একজন আদর্শ শিক্ষা প্রশাসক হিসেবে।
দীর্ঘদিন সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের পর ২০১০ সালে তিনি ধনবাড়ী উপজেলার বলদীআটা ফাযিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসায় অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন। এখানেও তিনি টানা ১৬ বছর সততা, নিষ্ঠা, দক্ষতা ও মানবিক নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিয়েছেন। শিক্ষার মানোন্নয়ন, শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং নৈতিক মূল্যবোধ গড়ে তোলায় তাঁর অবদান শিক্ষার্থীদের জীবনে আলো জ্বালিয়ে রাখবে।
আজ তাঁর শেষ কর্মদিবসে মাদ্রাসা প্রাঙ্গণ যেন এক আবেগের নদীতে পরিণত হয়। ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক-কর্মচারী, সাবেক শিক্ষার্থী ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ—কেউই চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমর পঙ্ক্তি যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছিল—
“যেতে নাহি দিব!
হায়, তবু যেতে দিতে হয়,
তবু চলে যায়।”
শেষ কর্মদিবস উপলক্ষে মাদ্রাসার পক্ষ থেকে তাঁকে অনাড়ম্বর, গভীর সম্মানে ও ভালোবাসায় বিদায় সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ছাত্র-ছাত্রী, প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা উপহার প্রদান করা হয়। উপাধ্যক্ষ নজরুল ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন সাবেক গভর্নিং বডির সদস্য হায়দার আলী মেম্বার। আবেগভরা কণ্ঠে তিনি অধ্যক্ষ আফজাল হোসাইনের সততা, আদর্শ ও শিক্ষাক্ষেত্রে অনন্য অবদানের কথা স্মরণ করেন।
শিক্ষকদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন মাধ্যমিক শাখার সহকারী মৌলভী সাইফুল ইসলাম, সহকারী অধ্যাপক খলিলুর রহমান, সহকারী অধ্যাপক শহীদুল্লাহ মিন্টু ও সহকারী অধ্যাপক এ কে এম মোজাম্মেল হোসেন। প্রত্যেকেই বক্তব্য দিতে গিয়ে আবেগে কণ্ঠরুদ্ধ হয়ে পড়েন, চোখ ভিজে ওঠে অশ্রুতে।
বিদায়ী বক্তব্যে অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আফজাল হোসাইন নিজেও আবেগ সামলাতে পারেননি। চোখের জলে ভেজা কণ্ঠে তিনি শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের হৃদয় ছুঁয়ে যান। জীবনের সব ভুল-ত্রুটির জন্য সবার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং প্রতিষ্ঠানের সার্বিক কল্যাণ কামনা করে দোয়া করেন। শেষে সবার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানান।
এছাড়াও বলদীআটা ফাযিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার পাশাপাশি ধনবাড়ী উপজেলা বিএমজিটিএ’র পক্ষ থেকেও তাঁকে আলাদা বিদায় সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। এতে বিএমজিটিএ’র কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদকসহ উপজেলা সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। বক্তারা অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আফজাল হোসাইনের সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও আগামীর জীবন আলোকিত হোক—এই কামনায় দোয়া করেন।
একটি অধ্যায় আজ শেষ হলেও অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আফজাল হোসাইনের নাম থেকে যাবে শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে, সহকর্মীদের স্মৃতিতে এবং বলদীআটা ফাযিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার ইতিহাসে—গভীর শ্রদ্ধা ও অকৃত্রিম কৃতজ্ঞতায়।









